মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ

 


ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ (২৩ আগষ্ট)। বাংলাদেশে সুস্থধারার রাজনীতির অন্যতম পথিকৃৎ, এশিয়া মহাদেশের বাম প্রগতিশীল আন্দোলনের পুরুধা ‘কুড়ের ঘরের ন্যাপ মোজাফ্ফর’ খ্যাত এ রাজনীতিবিদ ২০১৯ সালের এই দিনে ৯৭ বছর বয়সে রাজধানী ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা যান।

আজ (২৩ আগষ্ট) অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী পালন উপলক্ষে নিজ উপজেলা কুমিল্লার দেবিদ্বার’র এলাহাবাদ গ্রামে তার সমাধিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পন করবেন ন্যাপ কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আইভি রহমানের (অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ এক মাত্র কণ্যা) নেতৃত্বে একটি দল। এ ছাড়াও চট্রগ্রাম, নারায়নগঞ্জ, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলার ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও অন্যান্য দল, গনসংগঠন পূষ্পার্ঘ্য অর্পণে শ্রদ্ধা জানাবেন। এছাড়াও দোয়া মাহফিল ও আলোচনা সভার ও আয়োজন করা হয়েছে।

অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ ১৯২২ সালের ১৪ এপ্রিল কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম আলহাজ্ব কেয়াম উদ্দিন ভূইয়া, মায়ের নাম আফজারুন্নেছা। বাবা ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক। মোজাফ্ফর আহমদ স্থানীয় হোসেনতলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথিমিক শিক্ষা, জাফরগঞ্জ রাজ ইনস্টিটিউশন ও দেবিদ্বার রেয়াজউদ্দিন পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক এবং ভিক্টোরিয়া কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে সম্মানসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি গ্রহণ করেন এবং ইউনেস্কো থেকে ডিপ্লোমা লাভ করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতি ছাত্র মোজাফ্ফর আহমেদ দীর্ঘদিন বিভিন্ন কলেজে শিক্ষকতা করেন। সর্বশেষ তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা করেন ১৯৫২ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত। তার রাজনৈতিক জীবন অত্যন্ত বর্ণিল। রাজনীতি অঙ্গনে তার শুভসূচনা হয় ১৯৩৭ সালের দিকে। তিনি ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে সম্পূর্ণভাবে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের (শেরে বাংলা-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দী) প্রার্থী হিসেবে নিজের এলাকা কুমিল্লার দেবিদ্বার থেকে প্রভাবশালী মুসলিম লীগ প্রার্থী ও তদকালীন শিক্ষামন্ত্রী মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ’কে বিপুল ভোটে পরাজিত করে তাক লাগিয়ে দেন।

আওয়ামী লীগের বিরোধিতা সত্ত্বেও ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদে ন্যাপ’র প্রতিনিধি হিসেবে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ আ লিক স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। সামরিক শাসক আইয়ুব সরকার তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ও হুলিয়া জারি করে ১৯৫৮ সালে। তাকে ধরিয়ে দিলে পুরস্কার প্রাপ্তির ঘোষণা পর্যন্ত করা হয়। আত্মগোপন থাকা অবস্থায় তিনি আইয়ুব সরকার শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন সুসংগঠিত করেন। দীর্ঘ আট বছরব্যাপী আত্মগোপনে থাকার পর ১৯৬৬ সালে তিনি প্রকাশ্য রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন করেন।

১৯৬৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি নির্বাচিত হন অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ। অবিভক্ত পাকিস্তান ন্যাপের যুগ্ম সম্পাদকও ছিলেন তিনি। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব সরকার বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি কারাবরণও করেছেন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার তথা মুজিবনগর সরকার ছয় সদস্যের যে উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেছিল তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ এবং সেই ৬ জনের মাঝে। তিনি স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সফর করেন। সে সময় তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ন্যাপ, সিপিবি ও ছাত্র ইউনিয়ন এর গঠিত বিশেষ গেরিলা বাহিনী গঠনে (উনিশ হাজার মুক্তিযোদ্ধা) অধ্যাপক মোজাফ্ফ আহমদের ভূমিকা অবিস্মরণীয়।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লার দেবিদ্বার আসন থেকে ১৯৭৯ সালে সংসদ নির্বাচনে কুঁড়েঘর প্রতীক নিয়ে বিজয়ী হন। ১৯৮১সলে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনে অংশ নেন। ১৯৮২সালে স্বৈরাচারী শাসক এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের শুরুতে তিনি কারারুদ্ধ হন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, সোভিয়েত ইউনিয়ন, বুলগেরিয়া, অস্ট্রিয়া, দক্ষিণ ইয়েমেন, লিবিয়া, আফগানিস্তান, ভারত, মধ্যপ্রাচ্যসহ পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপের নানান দেশে সফর করেন।

সরকার ২০১৫ সালে অন্যদের সঙ্গে তাকেও স্বাধীনতা পদক দেয়ার ঘোষণা দিলে তিনি সবিনয়ে তা নিতে অস্বীকার করেন। তার মতে ‘রাজনীতির অর্থ দেশসেবা, মানুষের সেবা। পদ বা পদবির জন্য কখনো রাজনীতি করিনি। পদক দিলে বা নিলেই সম্মানিত হয়, এই দৃষ্টিভঙ্গিতে আমি বিশ্বাসী নই।’


Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন